গাইবান্ধায় জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের হওয়ার পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে আসামিরা। পুলিশ তাদের গ্রেফতার না করায় উল্টো আসামিদের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত মামলা প্রত্যাহার ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন মামলার বাদী এবং তার পুরো পরিবার।
স্থানীয় ও মামলা সূত্রে জানা যায়, সদর উপজেলার মালিবাড়ী ইউনিয়নের কিশামত মালিবাড়ী (ধর্মপুর) গ্রামের নয়া মিয়ার পুত্র এরশাদ মিয়ার সাথে
একই গ্রামের প্রতিপক্ষ মফিজল হকের পুত্র আলম বাদশার জমি-জমা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। এরই এক পর্যায়ে গত ০৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। এর এক পর্যায়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আলম বাদশা ও তার সহযোগীরা দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এরশাদ মিয়ার পরিবারের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এই হামলায় এরশাদ মিয়ার পরিবারের দুই নারীসহ মোট ছয়জন গুরুতর আহত হন। আহত ব্যক্তিরা হলেন—নুরী বেগম, জহুরুল ইসলাম, হাজিরন বেগম, নয়া মিয়া, সাইফুল ইসলাম ও সাইদুল ইসলাম। হামলাকারীরা এ সময় আহতদের কাছে থাকা নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকারও লুটে নেয়। স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। তবে নুরী বেগম, জহুরুল ইসলাম, হাজিরন বেগম ও সাইফুল ইসলামের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন।
এই নৃশংস হামলার ঘটনায় ভুক্তভোগী এরশাদ মিয়া বাদী হয়ে গত ০৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আলম বাদশাসহ ৮ জন এবং আরও অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জনকে অভিযুক্ত করে গাইবান্ধা সদর থানায় একটি মামলা (নং- ১৪/২৬) দায়ের করেন। তবে মামলা দায়েরের বেশ কয়েক দিন অতিবাহিত হলেও কোনো অভিযুক্ত গ্রেফতার না হওয়ায় বুধবার ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ দুপুর ১টার দিকে নিজেদের বাড়ির সামনে রাস্তার ওপর এক বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন ভুক্তভোগী পরিবার।
এলাকাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই মানববন্ধনে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি এলাকার অসংখ্য নারী-পুরুষ সংহতি প্রকাশ করে অংশ নেন। এ সময় অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানান।
মামলার বাদী এরশাদ মিয়া ক্ষোভ ও শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “আলম বাদশা ও তার সহযোগীরা অন্যায়ভাবে আমাদের ভোগদখলীয় জমি দাবি করে বেদখল দিতে চায়। এতে বাধা দেওয়ায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে আমার পরিবারের নারীদের ওপরও হাত তুলেছে, আমাদের রক্তাক্ত করেছে। থানায় মামলা করার পর তাঁরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আমাদের প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। আমরা এখন ঘরে ঘুমাতে পারছি না, চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রতিপক্ষ আলম বাদশার পিতা মফিজল হকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব দাবি অস্বীকার করেন। মফিজল হক জানান, “কয়েক বছর আগে এরশাদ মিয়ার পিতা নয়া মিয়া আমাদের কাছে জমি বিক্রি করার কথা বলে মূল্য নির্ধারণ করেন এবং কিছু টাকা বায়না বাবদ নেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি জমি দলিল করে দিতে নানা টালবাহানা শুরু করেন। সম্প্রতি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে গিয়ে দলিলের লেখাজোকা সম্পন্ন হলেও, শেষ মুহূর্তে ভিন্ন এক অজুহাতে দলিল সম্পাদন না করেই তিনি বাড়ি ফিরে যান।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “জমি না পেয়ে আমরা আমাদের দেওয়া টাকা ফেরত চাইলে, গত ০৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এরশাদ মিয়া দলবল নিয়ে আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তারা আমাদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও মারধর করে, এতে আমাদের পক্ষের ২ জন গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় থানায় একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছে। এর আগেও এরশাদ মিয়া লোকজন নিয়ে আমাদের ওপর চড়াও হয়েছিলেন। মূলত আমাদের হয়রানি করতেই তারা এই মিথ্যা মামলা দিয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে হুমকির যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।”
এলাকার সচেতন নাগরিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “দিনের আলোতে প্রকাশ্য দিবালোকে দুই নারীসহ ছয় জনকে পিটিয়ে আহত করার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। মামলা হওয়ার পরও অভিযুক্তরা কেনো গ্রেফতার হচ্ছে না, তা রহস্যজনক। অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে এলাকায় শান্তি ও ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার।”
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে গাইবান্ধা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. নাজমুল হুদা জানান, “দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযুক্তদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
ভুক্তভোগী পরিবারটি অবিলম্বে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে, যাতে অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়।