বিশ্ব শিক্ষক দিবসে দেশের ১০২ গুণী শিক্ষকের তালিকায় গাইবান্ধার লুৎফর রহমান
স্টাফ রিপোর্টার
/ ৭৫
Time View
Update :
মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:১৬ পূর্বাহ্ন
Share
মাত্র এক টাকার বিনিময়ে ৫২ বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়িয়ে আসছেন গাইবান্ধার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামের লুৎফর রহমান। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘১ টাকার মাস্টার’ নামে। অর্থের বিনিময়ে নয়, ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা থেকেই দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দেশের ১০২ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দিয়েছে সরকার। সেই সম্মাননার তালিকায় স্থান পেয়েছেন গাইবান্ধার এই ‘১ টাকার মাস্টার’ লুৎফর রহমান। তাঁর এই স্বীকৃতিতে আনন্দিত গাইবান্ধার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
জানা যায়, ১৯৭২ সালে ফুলছড়ি উপজেলার গুণভরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন লুৎফর রহমান। এর দুই বছর পর ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ নদীভাঙনে তিনি সর্বস্ব হারিয়ে গিদারী ইউনিয়নের ওয়াপদা বাঁধে আশ্রয় নেন। সেই সময় থেকেই শুরু হয় তাঁর ব্যতিক্রমী শিক্ষাসেবা। এরপর পেরিয়ে গেছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। পায়ে হেঁটে কিংবা সাইকেলে চড়ে গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়ে তিনি শিশুদের পড়িয়েছেন।
দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশুর পক্ষে পড়াশোনার খরচ বহন করা সম্ভব হয় না। তাদের কথা বিবেচনা করেই মাত্র এক টাকা পারিশ্রমিকে পড়ানোর উদ্যোগ নেন লুৎফর রহমান। তাঁর কাছে অর্থের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা।
লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমি চাই টাকার অভাবে যেন কোনো শিশুর পড়ালেখা বন্ধ না হয়। যতদিন পারি, আমি পড়িয়ে যাব।’
স্থানীয় বাসিন্দা রেজাউল বলেন, ‘স্যার অনেক ভালো পড়ান। তিনি টাকার জন্য পড়ান না, ভালোবাসা থেকেই পড়ান। গ্রামের অনেক শিশুই তাঁর কাছে পড়াশোনা করে উপকৃত হয়েছে।’
স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী সালাহউদ্দিন কাসেম বলেন, লুৎফর রহমানের মতো মানুষ সমাজের জন্য অনুপ্রেরণা। শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো। তাঁর পাশে থেকে কাজ করার চেষ্টা থাকবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘ ৫২ বছরের শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থী তৈরি করেছেন লুৎফর রহমান। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারের প্রত্যাশা না করেই তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শিশুদের পড়িয়ে গেছেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, সমাজ পরিবর্তনে বড় আয়োজনের চেয়ে মানুষের আন্তরিক ইচ্ছা ও দায়িত্ববোধই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার অধিকার সবার—এই বিশ্বাসকে ধারণ করে এখনও কাজ করে যাচ্ছেন ‘১ টাকার মাস্টার’। তাঁর কাছে শিক্ষকতা শুধু জীবিকা নয়; বরং একটি শিক্ষিত ও মানবিক সমাজ গঠনের আজীবন সাধনা। তাই স্থানীয়দের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন, বরং একটি ‘জীবন্ত পাঠশালা’।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সরকারি সম্মাননায় তাঁর অন্তর্ভুক্তি দীর্ঘদিনের এই নিঃস্বার্থ শিক্ষাসেবারই স্বীকৃতি বলে মনে করছেন গাইবান্ধার মানুষ।