ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। অধিকাংশ মানুষ যখন গভীর ঘুমে, ঠিক তখনই হাতে কোদাল, চাকু, সাবান, হুইল পাউডার, বালতি আর কয়েকটি গাছ নিয়ে ভ্যানে চড়ে বেরিয়ে পড়েন গাইবান্ধার এক যুবক। লক্ষ্য একটাই পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর একটি গাইবান্ধা গড়ে তোলা।
নিজের ব্যবসার ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন ভোরে রাস্তায় নেমে মাইলফলক, সাইনবোর্ড, যাত্রীছাউনি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামফলক, এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের কবরের ফলকও পরিষ্কার করেন তিনি। পাশাপাশি নিয়মিত বৃক্ষরোপণও করে চলেছেন সম্পূর্ণ নিজের অর্থ ও শ্রমে।
তিনি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের টেংগরজানী গ্রামের বাসিন্দা রেজওয়ান আনাম। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও মানবসেবামূলক নানা উদ্যোগের কারণে ইতোমধ্যেই জেলার মানুষের কাছে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবেই বেশি পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
প্রতিদিন ভোর প্রায় ৫টার দিকে দিনের কাজ শুরু করেন রেজওয়ান। কোনো দিন গাইবান্ধা জেলা কারাগারের সামনের সড়কে গাছ লাগাচ্ছেন, আবার কোনো দিন বালাসীঘাট সড়কে ধুলাবালি ও শ্যাওলায় ঢেকে যাওয়া মাইলফলক কিংবা সাইনবোর্ড পরিষ্কার করছেন। প্রায় এক বছর ধরে নিয়মিত এই কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
নিজ উদ্যোগে জেলার সাতটি উপজেলার বিভিন্ন সড়কে ঘুরে ঘুরে পরিষ্কার করছেন রাস্তার মাইলফলক, দিকনির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড, যাত্রীছাউনি, স্কুল-কলেজ, কমিউনিটি ক্লিনিক, হাসপাতাল, মসজিদসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নামফলক। শুধু পরিষ্কার করেই থেমে থাকেন না। যেসব ফলকের লেখা সময়ের সঙ্গে মুছে গেছে, সেখানে নতুন করে রং করে লেখাগুলো স্পষ্ট করে দেন। অনেক জায়গায় আগাছা ও ঝোপঝাড় কেটে ফলকগুলো দৃশ্যমানও করে তোলেন। পাশাপাশি প্রতিদিন ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করে সবুজায়নেও ভূমিকা রাখছেন।
তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেকেই এটিকে নাগরিক দায়িত্ববোধের অনন্য উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
রেজওয়ান আনাম বলেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ও সাইনবোর্ড ধুলাবালি, শ্যাওলা ও আগাছায় ঢেকে থাকায় পথচারী ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ গন্তব্য খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েন। এই বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তোলে। সেখান থেকেই মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা জন্ম নেয়। এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শতাধিক মাইলফলক, নামফলক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড পরিষ্কার করেছি। পাশাপাশি নিয়মিত বৃক্ষরোপণও করছি।
স্থানীয়দের মতে, সড়ক নির্মাণের সময় বিভিন্ন স্থানে মাইলফলক ও নামফলক স্থাপন করা হলেও পরে সেগুলোর তেমন কোনো রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। ফলে ধুলাবালি, শ্যাওলা ও আগাছায় ঢেকে গিয়ে অধিকাংশ ফলকের লেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। এতে পথচারী ও যানবাহনের চালকদেরও নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। রেজওয়ান আনামের উদ্যোগে এসব ফলক আবারও দৃশ্যমান হয়ে সাধারণ মানুষের উপকারে আসছে।
গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব মোরশেদ হাসান দীপন বলেন, ‘আমি নিয়মিত রেজওয়ান আনামের বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ দেখে থাকি। সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে ও নিজের অর্থ ব্যয় করে তিনি যেভাবে গাইবান্ধাকে পরিচ্ছন্ন ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে কাজ করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগ অন্যদেরও সমাজের জন্য কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে।’
এ বিষয়ে গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুলফিকার রহমান বলেন, ‘রেজওয়ান আনাম দীর্ঘদিন ধরে নিজ উদ্যোগে ও নিজ অর্থায়নে বিভিন্ন সেবামূলক কাজ করে আসছেন। বিশেষ করে অযত্নে পড়ে থাকা নামফলক ও মাইলফলক পরিষ্কার করে তিনি সাধারণ মানুষের চলাচল সহজ করছেন। তার এই উদ্যোগে যেমন এলাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি মানুষও প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে জানতে পারছেন। এটি নিঃসন্দেহে অনুসরণযোগ্য একটি উদ্যোগ।’
নিজের অর্থ, সময় ও শ্রম দিয়ে সমাজের জন্য কাজ করে রেজওয়ান আনাম প্রমাণ করেছেন পরিবর্তনের জন্য বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন কেবল আন্তরিক সদিচ্ছার। তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শুধু গাইবান্ধার সড়ককেই পরিচ্ছন্ন করছে না, সমাজের মানুষকেও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে এগিয়ে আসার অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।